ইউপিডিএফকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার ও রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেছেন, “ইউপিডিএফকে দমন করার জন্য সেনাবাহিনীর প্রয়োজন পড়বে না। পাহাড়ের সাধারণ মানুষই আপনাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে যেখানে পাঠানোর সেখানেই পাঠিয়ে দেবে।”
আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাঙামাটি স্টেডিয়ামে আয়োজিত চ্যাম্পিয়নস লীগ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ইউপিডিএফ নেতা ও দলটির মুখপাত্র মাইকেল চাকমা পাহাড়ে সেনাবাহিনীর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর জবাবে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, সেনাবাহিনী পাহাড়ের মানুষের জন্য কী করছে- তার উত্তর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেই রয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, পাহাড়ের দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী নিয়মিত বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করছে। পাহাড়ি যুবক-যুবতীদের প্যারামেডিক প্রশিক্ষণ, ফার্স্ট এইড ক্যাডার প্রশিক্ষণ, নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ, চোখের ছানি অপারেশন এবং মেকানিক্যালসহ বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে তারা স্বাবলম্বী হয়ে নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে। এসব কার্যক্রম কোনো প্রচারণামূলক উদ্যোগ নয়, বরং পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনা থেকেই পরিচালিত হচ্ছে।
মাইকেল চাকমার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, “মাইকেল চাকমা সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের মুখপাত্র। আপনার কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই- সম্প্রতি পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগে আপনারা মানুষের পাশে দাঁড়াননি কেন? আপনারা তো প্রতি মাসে রাঙামাটি অঞ্চল থেকে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেন, যার কোনো টাকাই জনগণের জন্য খরচ করেন না।”
রাঙামাটি রিজিয়নের উদ্যোগে এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে জেলার ১০টি উপজেলা দল অংশ নিচ্ছে। পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং তরুণদের মাদক ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রাখাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান সালেহ আহম্মদ, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব, জেলা জামায়াতের আমীর আব্দুল আলীম, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভুট্রোসহ সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী খেলায় টাইব্রেকারে বরকল উপজেলা ফুটবল দল ৩-২ গোলে লংগদু উপজেলা ফুটবল দলকে হারায়। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর ফাইনাল খেলার মধ্য দিয়ে এই টুর্নামেন্টের সমাপ্তি ঘটবে।
১৮ মামলার আসামী ও ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত মাইকেল চাকমা
প্রসঙ্গত, বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ’র নেতা মাইকেল চাকমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়েরকৃত ১৮টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলার একটি বড় বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে। লংগদুতে ২০০৭ সালে জেলেদের মারধর ও টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুলাল উদ্দিনের মামলা, রঞ্জন চাকমা হত্যা মামলা, নানিয়ারচরের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা হত্যা মামলা, শক্তিমানের শেষকৃত্যে তপন জ্যোতি চাকমা বর্মার গাড়িবহরে হামলা ও হত্যাকাণ্ড, ২০১১ সালে জুরাছড়িতে নিরঞ্জন চাকমাসহ ৩ জনকে অপহরণ ও হত্যার মামলা, এবং ২০১৮ সালে বাঘাইছড়িতে সুরেন বিকাশ চাকমা, বন কুসুম চাকমা ও মিশন চাকমা হত্যা মামলায় তিনি প্রধান বা অন্যতম অভিযুক্ত।
এছাড়া ২০১১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি র্যাব-৭ এর একটি দল চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী থেকে দুটি এলজি ও দুই রাউন্ড গুলিসহ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। তৎকালীন সময়ে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন ও মাদক আইনেও মামলা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর রাঙামাটি বিশেষ জজ আদালত লংগদুর পৃথক দুটি মামলায় মাইকেল চাকমা ও তার সহযোগী সুমন চাকমাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। মাইকেল চাকমার এই দণ্ডাদেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে তার নামে থাকা চলমান অন্যান্য হত্যা মামলার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুসে উঠে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
বর্তমানে সাজাপ্রাপ্ত এই মাইকেল চাকমা ভারতে পলাতক রয়েছেন বলে জানা যায়।
মন্তব্য করুন