চৌষট্টি ঘরের দাবার ছকে প্রতিটি চালই যেন একেকটি স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়া। সেই স্বপ্নের পথ ধরে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করেছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার কিশোরী আদিবা আরশি বাঁধন। ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা-২০২৬-এর বড় গ্রুপের দাবা ইভেন্টে রানার্সআপ হয়েছে সে। তার এই অর্জনে আনন্দে ভাসছে পাহাড়ি জনপদ মাটিরাঙ্গা।
বাঁধন মাটিরাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। পড়াশোনাতেও সে সমান মেধাবী; শ্রেণিতে তার রোল নম্বর ১। জাতীয় পর্যায়ে তার সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের আমেজ তৈরি হয়েছে।
বাঁধনের দাবার জগতে প্রবেশের গল্পটিও বেশ চমকপ্রদ। করোনাকালে যখন সারা বিশ্ব কার্যত থমকে গিয়েছিল, তখন ঘরবন্দি সময়ে ব্যবসায়ী বাবা মোস্তফা কামালের পাশে বসে দাবা খেলার প্রাথমিক কৌশল শেখে সে। বাবা-মেয়ের অবসরের সেই খেলা ধীরে ধীরে পরিণত হয় গভীর ভালোবাসায়। একসময় দাবাই হয়ে ওঠে তার স্বপ্নপূরণের অন্যতম মাধ্যম।
ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে বাঁধনের এই প্রতিভাকে প্রতিযোগিতার মঞ্চে তুলে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক তুষিতার অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষক মধুসূদন রায়ের নিরলস সহযোগিতা ও কৌশলগত দিকনির্দেশনায় ধীরে ধীরে দক্ষ দাবাড়ু হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলে সে।
প্রতিযোগিতায় বাঁধনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা শুরু হয় ২০২৩ সালে। ওই বছর ৫০তম গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম নজর কাড়ে সে। ২০২৪ সালে ৫১তম আসরে জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। আর ২০২৬ সালে ৫৩তম আসরে জাতীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হয়ে সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যোগ করে এই কিশোরী।
শনিবার (১০ অক্টোবর) কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ অডিটোরিয়ামে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতার সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া সমিতির আয়োজনে এবং কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে বাঁধনের হাতে রানার্সআপ ট্রফি ও স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকার মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। এতে সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আহসান পারভেজ।
মেয়ের সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা সীমা আক্তার বলেন, “মেয়ের এ সাফল্যে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। ছোটবেলা থেকেই দাবার প্রতি ওর টান ছিল। আমরা সব সময় ওকে সমর্থন দিয়েছি। ও যেন ভবিষ্যতে দেশের জন্য আরও বড় সাফল্য আনতে পারে, সেজন্য সবার দোয়া চাই।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল হাশেম বলেন, “জাতীয় পর্যায়ে এই অর্জন পুরো মাটিরাঙ্গার জন্য এক বিরাট সম্মান। বাঁধন আমাদের প্রতিষ্ঠানের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, সামনে সে আরও বড় মঞ্চ কাঁপাবে।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে তাহমিনা মিতু বাঁধনকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় বাঁধনের এই অর্জন অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। এই ধরনের প্রতিভাবান কিশোরীদের বিকাশে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে পাশে দাঁড়াতে হবে।”
বাবার কাছ থেকে শেখা দাবার প্রথম চাল আজ বাঁধনকে পৌঁছে দিয়েছে জাতীয় প্রতিযোগিতার মঞ্চে। তার এই অর্জন শুধু পরিবারের গর্ব নয়, মাটিরাঙ্গার শিক্ষার্থী ও নতুন প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মন্তব্য করুন