পর্যটনের ভরা মৌসুমে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরোধের জেরে সাজেকে পর্যটন বন্ধের খেসারত দিচ্ছেন পর্যটন সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি বাসিন্দারা। দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের আনাগোনা ও হোটেল-রিসোর্টের বুকিং ঘিরে যখন বাড়তি ব্যবসার প্রত্যাশা, তখন নিরাপত্তার কারণে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় পরিবহনমালিক, চালক, রিসোর্ট-কটেজের কর্মী ও স্থানীয় দোকানিদের আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত ১১ অক্টোবর সকাল ছয়টা থেকে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করে ইউপিডিএফ (প্রসীত) দল সমর্থিত ‘সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’। তাদের অভিযোগ, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা পক্ষের সশস্ত্র সদস্যরা অবস্থান করছেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
অবরোধের কারণে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে আসা এবং খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকগামী পর্যটকবাহী গাড়ি বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়ে। জানা গেছে, দুই শতাধিক পর্যটকবাহী গাড়িতে দেড় হাজারের বেশি পর্যটক আটকে ছিলেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনার পর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বিক্ষোভকারীরা সড়ক থেকে সরে যান। এরপর গাড়িগুলো গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
তবে সড়কে অবরোধ স্থগিত হলেও সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি। রোববার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ ঘোষণা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের ১৩ অক্টোবর বিকেল পাঁচটার মধ্যে এলাকা ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, অনিবার্য কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পূজার মৌসুমে অনিশ্চয়তা
পর্যটনের ভরা মৌসুমে সড়ক অবরোধের পর সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে এ খাতের ব্যবসা। সামনে দুর্গাপূজার ছুটি থাকায় পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় রিসোর্ট-কটেজ, পর্যটক পরিবহন ও স্থানীয় ছোট ব্যবসাগুলোর আয় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খাগড়াছড়ি মাহিন্দ্রা মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির সভাপতি টুন্টু মনি চাকমার তথ্য অনুযায়ী, পর্যটনের ভরা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ৩০টি মাহিন্দ্রা ও জিপে প্রায় আড়াই হাজার পর্যটক সাজেকে যাতায়াত করেন। ফলে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকলে পরিবহন খাতের চালক ও মালিকেরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জানান, পূজার ছুটিকে সামনে রেখে সাজেকের রিসোর্টগুলোতে আগাম বুকিং ছিল। কিন্তু সড়কে অবরোধ ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্তে ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যাতায়াত স্বাভাবিক না হলে বুকিং পিছিয়ে দেওয়া বা টাকা ফেরত চাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে পূজার ছুটিতে বাড়তি আয়ের যে প্রত্যাশা ছিল, তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির অভিযোগ, গত ৩০ আগস্ট থেকে এলাকায় জেএসএসের সন্তু লারমা পক্ষের সশস্ত্র সদস্যরা অবস্থান করছেন। তাঁদের দাবি, এসব সদস্য স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। গত ৮ অক্টোবর উজোবাজারে সমাবেশ করে তাঁদের সরিয়ে নিতে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। দাবি পূরণ না হওয়ায় অবরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংগঠন দুটির বক্তব্য।
তবে জেএসএস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর ইউপিডিএফের সদস্যদের নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা আড়াল করতে জেএসএসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, তাঁদের চাপে অবরোধ ডাকা হয়নি। তবে সাধারণ মানুষের স্বার্থে সংগঠন দুটির কর্মসূচির প্রতি তাঁদের সমর্থন রয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের উদ্যোগ
সাজেকে পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর ভাষ্য অনুযায়ী, অনিবার্য কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অবরোধের কারণে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তফাজ্জল হোসেন। তবে পর্যটনকেন্দ্র কবে খুলবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।
মন্তব্য করুন